শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে আসছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী

  বাংলাদেশের কথা ডেস্ক
  প্রকাশিতঃ সকাল ১০:২৩, শুক্রবার, ১৩ মে, ২০২২, ৩০ বৈশাখ ১৪২৯

ইলিরা দেওয়ান। একজন চাকমা নারী, কাজ করছেন একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে। ইলিরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র ও রাজনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। চট্টগ্রামে তিনি তার উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ঢাকায় আসেন। এটি তার দ্বিতীয় চাকরি। পড়াশোনা থেকে চাকরি সব ক্ষেত্রে একজন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নারী বলে তাকে নানা রকম কটাক্ষ, বৈষম্য, উত্ত্যক্তকরণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেওয়ার আগ পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে তিনি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নারী—ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নারী এই বিষয়টা মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টার সম্মুখীন হতে হয়েছে। 

তারা কোটায় পড়াশোনা করেন। দয়া- দাক্ষিণ্যে চাকরি পান। তারা যেন কিছুই জানেন না—এমন একটা পরিবেশের মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে। বর্তমান চাকরিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নারী হিসেবে না দেখা হলেও তিনি খুব একটা যোগ্য নন, এমন মনোভাবের সম্মুখীন হতে হয়েছে। একই কথা বলেন, একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত সমাপ্তি সংমা। সমাপ্তি বলেন, ‘প্রতিনিয়তই আমার ভাষা, আমার জাতি-গোত্রের জন্য আমি বুলিংয়ের শিকার হচ্ছি। আমরা পড়াশোনা করেছি, কাজ করছি, তার পরও মানুষের হীনম্মন্যতা কাজ করে আমাদের নিয়ে।’ কিন্তু আমি বলতে পারি, ‘আদিবাসী নারীরা ১০ জন পড়াশোনা করলে ৯ জনই কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেন। আর নানা রকম বৈষম্যের শিকার হন।’

আদিবাসী ফোরামের তথ্যমতে, ‘৩০-৩৫ শতাংশ আদিবাসী জনগোষ্ঠী পড়াশোনা করছে। যার মধ্যে ১৫ শতাংশের বেশি নারী। যারা পড়াশোনা করছেন তাদের ৯০ শতাংশ পেশায় যান নানা রকম বৈষম্য মাথা পেতে নিয়ে।’ বিজ্ঞজনেরা বলেন, সামাজিক, পুরুষতান্ত্রিক, সাংস্কৃতিক ধর্মীয় বৈষম্য না করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকদের কর্মক্ষেত্রে উত্সাহিত করতে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

adibasi

কেমন বৈষম্য :ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নারীর বড় অংশ কাজ করেন বিউটি পার্লারে, তার পরই আছে গার্মেন্টস সেক্টর। আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সমন্বয়ক ফাল্গ~ণী ত্রিপুরা বলেন, ‘আদিবাসী নারীর একটা অংশ উচ্চশিক্ষিত হয়ে উচ্চপর্যায়ে কাজ করছে, এই অংশ খুব কম হলেও কর্মক্ষেত্রে কোনো রকম বেতন-ভাতা নিয়ে বৈষম্যের শিকার হয় না। তবে মধ্য পর্যায়ে মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক এমনকি স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনা করে যারা চাকরি করেন তারা খুবই বৈষম্যের শিকার হন। প্রতিনিয়তই আদিবাসী নারী, নারী, ঢাকায় অভিবাসী—এসব কারণে বেতন-ভাতা, বাড়িভাড়া, যাতায়াত, হোটেলে খাওয়া—এসব বিষয়ে বৈষম্যের শিকার হতে হয়। তারা শিক্ষিত হলেও তাদের কাজের যোগ্য বলে মনে করা হয় না। যারা উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করেন, তাদেরও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শুধু আদিবাসীবিষয়ক পরিকল্পনায় রাখা হয়। ভালো কোনো পরিকল্পনা বা প্রজেক্টে তাদের সুযোগ দেওয়া হয় না। পদোন্নতি হয় কম।’

আদিবাসী নারী পরিষদের সভাপতি বাসন্তী মুর মুউ বলেন, ‘একটি বাসে যদি আদিবাসী নারী বসে, তখন বাঙালিদের কেউ কেউ বাসে উঠেই বলে এই সর সর। তখন ঐ আদিবাসী জায়গা ছেড়ে দেয়। প্রতিনিয়তই আদিবাসী নারীদের এমন করে পেশার ক্ষেত্রেও জায়গা ছেড়ে দেওয়ার অসংখ্য উদাহরণ আছে। কেউ যৌন হয়রানির শিকার হলে থানার ওসি মামলা নেয় না। আমরা সংগঠনের হয়ে গেলে আমাদের গালাগাল করা হয়। যখন আমরা প্রতিবাদী হই তখনই মামলা নেয়। কিন্তু কয়জন আদিবাসী নারী প্রতিবাদী হতে পারে?’

woman-11

এগিয়ে আসছেন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নারী :একটি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত ম্যাথিউস চিরান বলেন, ‘আমার বয়স ৩০ বছর পার হয়েছে, আমার বয়সি নারীরা শিক্ষিত হয়ে কর্মক্ষেত্রে কমই এসেছেন। কিন্তু আমাদের পরের প্রজন্মের আদিবাসী নারীরা  শিক্ষিত হয়ে কর্মক্ষেত্রে ভালোভাবেই প্রবেশ করছেন। যদিও তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। তার পরও তারা যুদ্ধ করে টিকে আছেন।’

সমাপ্তি সংমা বলেন, ‘যেসব পরিবার আদিবাসী মেয়েদের পড়াশোনা করায় তারা একটা স্বপ্ন নিয়েই স্কুলে পাঠায়। মেয়েরাও সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকে। তাই পড়াশোনা করা মেয়েরা প্রায় সবাই ছোটবড় যা-ই হোক কাজ করে।’ ব্র্যাকের ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম ফর ইন্ডিজেনাস পিপলস-এ কাজ করেন ১০ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নারী। তাদের একজন আলপনা জয়ন্তী কুজুর। এটি তার তৃতীয় চাকরি। তিনি জানান, চাকরি ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্যের শিকার না হলেও শিক্ষা ও চাকরির ভাইভা দিতে গিয়ে নানা রকম অবান্তর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্যমতে, ‘দেশে শিক্ষিতের হার ৭৫ হলে আদিবাসী শিক্ষার হার ৩০ থেকে ৩২ শতাংশ। যার মধ্যে নারী ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ।’ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, ‘আদিবাসী নারী রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিকভাবে বহুমুখী বৈষ্যমের শিকার। আদিবাসীরা যেসব স্থানে থাকে পাহাড়, বন কিংবা সমতলে সেখানে সরকারি স্কুল নেই। তাদের চারটি মাতৃভাষায় বই হয়েছে কিন্তু শিক্ষক নেই, তাদের জন্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরোর কোনো জরিপ নেই। তাই আমরা যা-ই বলি, সবই কাজের অভিজ্ঞতা থেকে অনুমাননির্ভর। আদিবাসীদের জন্য বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কিছু শিক্ষা কার্যক্রম আছে। তারা সভ্যতা থেকে দূরে থাকে। তাদের মাতৃভাষা আলাদা। তাই তাদের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা করে বাজেটে বরাদ্দ করতে হবে বলে মনে করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, ‘বৈচিত্র্যকে নেতিবাচক মনে করা হয়। এই মনোভাব পরিবর্তন জরুরি। যারা পিছিয়ে আছেন তাদের জন্য কোটার সুষ্ঠু ব্যবহার করতে হবে। রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিকভাবে বহুমুখী বৈষম্যের অবসান করতে হবে। তা মুখে বললে হবে না। রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে।’

বিষয়ঃ বাংলাদেশ

Share This Article


‘ভালো ছেলেরা রাজনীতিতে না আসায় বদি-মমতাজরা ঢুকে পড়েছে’

পাঁচ বছর পর শ্বশুরবাড়ি আসছেন শেখ হাসিনা, নানান আয়োজন

বিচ্ছুরণের গ্র্যান্ড ফাইনাল কাল

সামনে সরকার কোনো বিপদ দেখছে না

ফেসবুকে ক্ষতিকর ভেষজ ওষুধ বাণিজ্যের হাট

অবরোধ কেবল ঘোষণাতেই, সড়কে প্রভাব নেই

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অপ্রতিরোধ্য, ধারণায় চিড়

যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন

প্রধান চার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ, ১২ পণ্যে শীর্ষ দশে

দাঙ্গা বাঁধানোর উদ্দেশে মৃতের তালিকায় জীবিত, এটাই কি মানবাধিকার?

ভারী হচ্ছে রোহিঙ্গা বোঝা

হাসপাতালে শয্যার জন্য ডেঙ্গু রোগীর হাহাকার