বৃহৎ অর্থনীতির সফল স্বপ্নদ্রষ্টা মুহিত

  বাংলাদেশের কথা ডেস্ক
  প্রকাশিতঃ দুপুর ০২:৪৪, রবিবার, ১ মে, ২০২২, ১৮ বৈশাখ ১৪২৯

টানা ১০ বার আর মোট ১২ বার! একটি স্বাধীন দেশের ইতিহাসের বাজেট প্রণেতা হিসেবে এমন সম্মানের অধিকারী বিশ্বে বিরল। আর এই সম্মানের অধিকারীই হয়েছিলেন সদ্য প্রয়াত সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। আধ্যাত্মিক নগরী সিলেটে জন্ম নেয়া এই সফল অর্থনীতিবিদের বর্ণাঢ্য জীবন ঈর্ষণীয় পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি নিজেই। আর তাই তো পাকিস্তান সরকার থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলায় সামরিক সরকারের অধীনে কাজ করেও হয়েছেন সর্বজন সমাদৃত। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে।


বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী আবুল মাল আবদুল মুহিতের জন্ম ১৯৩৪ সালে সিলেটের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তৎকালীন সিলেট জেলা মুসলিম লীগের নেতা আবু আহমদ আবদুল হাফিসের দ্বিতীয় ছেলে ছিলেন তিনি। তার মা সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরীও সক্রিয় ছিলেন রাজনীতিতে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন তার ছোট ভাই।

আবুল মাল আবদুল মুহিত ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে সিলেটের এমসি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে ইংরেজী সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজী সাহিত্যে ¯œাতক (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন তিনি। পরের বছর একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। অংশ নেন ভাষা আন্দোলনে। ছাত্রজীবনে সলিমুল্লাহ হল ছাত্র সংসদের ভিপিও নির্বাচিত হন তিনি। বিদেশে চাকরিরত অবস্থায় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন তিনি। আর ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাভ করে এমপিএ ডিগ্রী।


বারে বারে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব সফলতার সঙ্গে পালন করলেও পড়ালেখার শুরুটা ছিল তার ইংরেজী সাহিত্যে। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেয়ার পর তখনকার পাকিস্তান এবং পরে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো মুহিত তখন ওয়াশিংটন দূতাবাসে কূটনৈতিক দায়িত্বে ছিলেন। জুন মাসে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে জনমত তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

থেমে থাকেননি ওখানেই। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষ স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন বিপর্যস্ত তখন ১৯৭২ সালে দায়িত্ব পান পরিকল্পনা সচিবের। সফলতার সঙ্গে এই দায়িত্ব পালনের পর ১৯৭৭ সালে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বহিঃসম্পদ বিভাগের সচিব হন মুহিত। ১৯৮১ সালে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন। কাছের মানুষজন ভেবেছিলেন এই বুঝি শেষ। কিন্তু কে ভেবেছিল যে এখান থেকে হবে তার নতুন পথ চলা। আর হলোও তাই। তিনি যোগ দিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফোর্ড ফাউন্ডেশন ও আইএফডিতে ‘অর্থনীতি ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ হিসেবে’।


এ যাত্রা দীর্ঘায়িত হয় ১৯৮২-৮৩ সালে তখনকার এইচএম এরশাদ সরকারের সময়। তখন তিনি প্রথমবারের মতো অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্বে আসেন। দীর্ঘদিন বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে কাজ করার পর দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আমলাখ্যাত এই অর্থনীতিবিদই সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট চেয়ে নির্বাচিত হন সংসদ সদস্য। সিলেটের জনগণের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হওয়া এই সংসদ সদস্যকে যথাযোগ্য সম্মান দেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। ২০০৯ সালের জাতীয় সংসদে তাকে দেয়া হয় সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দফতর অর্থ মন্ত্রণালয়ের। ধারাবাহিকতা বজায় থাকে ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের টানা দ্বিতীয় মেয়াদেও। তার কাঁধেই আবারও আস্থা রাখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফলে সব মিলিয়ে মোট ১২ বার এবং টানা ১০ বার বাংলাদেশের বাজেট ঘোষণার রেকর্ড গড়েন আবুল মাল আবদুল মুহিত।

টানা দশ বছর অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন শেষে ২০১৮ সালে অবসরে যান মুহিত। ২০১৯ সালের ২৪ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভার উত্তরসূরি আ হ ম মুস্তফা কামালের হাতে তুলে দেন তিনি।


সফলতার সঙ্গে দায়িত পালনকালীন তার পিছু ছাড়েনি সমালোচনাও। ইংরেজী সাহিত্য থেকে অর্থনীতি। পাকিস্তানের বিশ্বস্ত আমলা থেকে বাংলাদেশের শীর্ষ আমলা। আমলা থেকেই এককালে স্বৈরশাসকের মন্ত্রী। অনেকদিন পরে তিনিই আবার মাঠের রাজনীতিকদের কনুই মেরে আমজনতার ঘরে গিয়ে হেসে ভোট চাওয়া। সবাই তাকে ভোট না দিলেও কেউ যে তাকে গালি দেয়নি এটা শতভাগ নিশ্চিত বলেই মনে করেন তার সঙ্গে মেশা ঘনিষ্ঠজনরা। স্বভাবসুলভ বোগাস-রাবিশ বলা ছিল তার নিয়মিত বাক্য।

তার আমলে অর্থনীতিকে, বাজেটকে বড় করে দেখার চোখ হয়েছে বাংলাদেশের। যদিও বাজেটের আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গুণগত পরিবর্তন তেমন ঘটেনি ওই সময়। এমনকি বাজেটের আকার আদতেই বড় হয়েছে কিনা সে প্রশ্নও আছে। জিডিপির ১৭ বা ১৮ শতাংশের বেশি কখনও হয়নি। কিন্তু সেটিও কখনও সেভাবে বাস্তবায়িত হতে পারেনি তার আমলে।

সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি, বেসিক ব্যাংক লোপাট হওয়া, বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি, ক্রিসেন্ট গ্রুপের জনতা ব্যাংকের তিন হাজার কোটি টাকার জালিয়াতি সবই তার সময়ের ঘটনা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মতো ঘটনা তার সময়েই। তারপরও ছিলেন সর্বজন সমাদৃত। সব সমালোচনা পেরিয়ে সফলতার সঙ্গেই পালন করেছেন অর্পিত সব দায়িত্ব।

রাজনীতি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের ঘোষণায়ও তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। অবসর নিয়েও মুজিববর্ষ উদযাপন জাতীয় কমিটিতে রাখেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য পদে তিনি আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করে গেছেন। শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষের জাতীয় অনুষ্ঠানে গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর অংশগ্রহণ করেন তিনি।

রাজনীতি, আমলার বাইরেও ছিল তার স্বকীয় লেখক পরিচিতি। মুক্তিযুদ্ধ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ইতিহাস, জনপ্রশাসন এবং রাজনীতি নিয়ে ৩০টির অধিক বই লিখেছেন সফল এই অর্থমন্ত্রী। এর যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকেও। জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ২০১৬ সালে ভূষিত করা হয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কারে’।

আবুল মাল আবদুল মুহিতের স্ত্রী সাবিয়া মুহিত একজন ডিজাইনার। তাদের তিন সন্তানের মধ্যে প্রথম কন্যা সামিনা মুহিত ব্যাংকার ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞ, বড় ছেলে সাহেদ মুহিত বাস্তুকলাবিদ এবং ছোট ছেলে সামির মুহিত যুক্ত রয়েছেন শিক্ষকতা পেশায়।

সফল এই অর্থনীতিবিদের মৃত্যুতে শোক নেমে এসেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের মৃত্যুতে এক শোকবার্তায় বলেন, বরেণ্য অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদে দায়িত্ব পালনকারী অনন্য সফল অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে শোকাহত।

তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে প্রতিবেশী দেশ ভারতও। শনিবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মুহিতের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলে, একজন সরকারী কর্মচারী হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিএকজন বিশিষ্ট লেখক, দক্ষ অর্থনীতিবিদ এবং একজন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ। তার আত্মার শান্তি কামনা কর।

 

Share This Article