সরেজমিন সারা দিন

টাকা দিলে সবই জায়েজ, দালালে ঘেরা উত্তরা বিআরটিএ

  বাংলাদেশের কথা ডেস্ক
  প্রকাশিতঃ সকাল ০৯:২৮, বৃহস্পতিবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২১, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
বিআরটিএ
বিআরটিএ

তোহুর আহমদ

রাখঢাক নেই। অফিস চত্বরে পা দিতেই জেঁকে ধরে দালালচক্র। সবার মুখে একই কথা-‘কী কাজ ভাই। কেন এসেছেন। কী করতে হবে।’ এরপর অনেকটা প্রকাশ্যেই দরকষাকষি শুরু।

 

উত্তরা দিয়াবাড়ি বিআরটিএ অফিসের মূল ভবন থেকে শুরু করে আশপাশের চায়ের স্টল, ফটোকপির দোকান, এমনকি ফাঁকা মাঠ-সর্বত্র দালালের ছড়াছড়ি। ফলে সেবার্থীদের ভোগান্তি চরমে। মঙ্গলবার দিনভর অফিস চত্বরে অবস্থান করে দালালচক্রের এরকম অবাধ বিচরণ দেখা যায়।

ঘুসের রেট : বিআরটিএ কার্যালয়ে পরতে পরতে ঘুসের রেট বাঁধা। এর মধ্যে ছয় থেকে আট ধরনের কাজে ঘুস বাণিজ্য ব্যাপক। বিশেষ করে নম্বর প্লেট, ফিটনেস, লার্নার, মালিকানা পরিবর্তন, রেজিস্ট্রেশন এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স সংক্রান্ত কাজে ঘুস বাণিজ্য ওপেন সিক্রেট।

দালালচক্রের মাধ্যমে প্রতিটি কাজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন রেটে ঘুস আদায় করা হয়। যেমন : যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত কাজে ২ থেকে ৪ হাজার, মালিকানা পরিবর্তনে ৩ হাজার, ফিটনেস সংক্রান্ত কাজে এক থেকে দেড় হাজার টাকা ঘুস কাউকে না কাউকে দিতেই হয়। এছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্সের পরীক্ষায় পাশ করতে হলে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা ঘুস দেওয়া অনেকটা ‘বাধ্যতামূলক’।

দেখা যায়, অফিস চত্বরে দিনভর দেড় থেকে দুই হাজার সেবা প্রার্থী আসছেন। এর মধ্যে ৫শর বেশি ড্রাইভিং লাইসেন্স সংক্রান্ত ‘কেস’। কেউ ড্রাইভিং পরীক্ষা দিতে, কেউ আবার পেন্ডিং লাইসেন্স পেতে অনেকটা চরকির মতো ঘুরছেন। অবশ্য দালাল ধরলে কোনো ঝামেলা পোহাতে হয় না।

ড্রাইভিং পরীক্ষার মাঠে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, সাদা চুনের দাগ টেনে পাশাপাশি মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের ড্রাইভিং পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেখানে লোকজনের ভিড়সহ সার্বিক পরিবেশ পরিস্থিতির মধ্যে দক্ষতা প্রমাণের সুযোগ কম। পরীক্ষার এ সময়সীমা সর্বোচ্চ দেড় থেকে ২ মিনিট। এতে পাশের হার নগণ্য।

তবে ফেল করলে অসুবিধা নেই। সিস্টেমে পাশ দেখানোর ব্যবস্থা আছে দালালচক্রের হাতে। এ কারণে পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রার্থীদের বেশির ভাগই দালাল ধরে আসছেন। যাদের বাইরে থেকে দেখলে দালাল হিসাবে আঁচ করার উপায়ও নেই। তারা একেবারে কেতাদুরস্ত। অতি ভদ্রলোক।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দালাল যুগান্তরকে বলেন, এখানে দালালদের কাছে মানুষ জিম্মি। প্রত্যেক স্যারের নিজস্ব গেটিস (দালাল) আছে। ভাসমান দালালরা পার্টি ধরে। তারা ‘কেস’ অনুযায়ী দরকষাকষি করেন। অগ্রিম টাকা নেওয়ার পর ফাইল যায় গেটিসের কাছে। পরে হাতে হাতে ফাইল পৌঁছে যায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার টেবিলে।’ তার দাবি, অফিস ছুটির আগে ফাইল গুনে ঘুসের হিসাব করা হয়। প্রতিদিন এভাবে চলে অবৈধ টাকার ভাগবাঁটোয়ারা।

দেখা যায়, বিআরটিএ কর্মকর্তাদের নিজস্ব গেটিস হিসাবে পরিচিত দালালরা বেশ ক্ষমতাধর। তারা নিমিষেই যে কোনো সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম। তবে সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের পক্ষে গেটিসদের নাগাল পাওয়া দুষ্কর। ভাসমান দালালদের মাধ্যমে তাদের কাছে যেতে হয়।

দালালদের কয়েকজন যুগান্তরকে বলেন, উত্তরা বিআরটিএ অফিসে প্রভাবশালী গেটিস হিসাবে পরিচিত সবুজ, ফরহাদ ওরফে পিচ্চি ফরহাদ ও আব্দুল্লাহ। কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের ‘ডাইরেক্ট কানেকশন’। এছাড়া দালাল সোহেল, আবু বক্কর, রুবেল, বাবু ও শামসু ৩/৪ বছর ধরে সক্রিয়। এর বাইরে মাঠপর্যায়ে ভাসমান দালাল আছে অসংখ্য।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দিয়াবাড়ি বিআরটিএ অফিসে সহকারী পরিচালক চারজন-শহিদুল আজম, মোবারক হোসেন, ইমরান ও মাহফুজ। এছাড়া কয়েকজন পরিদর্শক এবং অফিস সহায়ক নিয়ে অফিসের জনবল ২০ জন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ঘুসের অভিযোগ প্রবল।

তবে সহকারী পরিচালক মোবারক হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ‘বাইরে থেকে ঢালাওভাবে অভিযোগ করা ঠিক নয়। দালালচক্র নিজেদের সুবিধার জন্য কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে চলে। সাধারণ মানুষের উচিত তার সমস্যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলা। তা না করে অনেকেই দালালচক্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ফলে তিনি অহেতুক বিড়ম্বনার মধ্যে পড়েন। এর জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘাড়ে দায় চাপানো অন্যায়।’

সরেজমিন দেখা যায়, সীমানাপ্রাচীরবিহীন অফিস চত্বর পুরোটাই অরক্ষিত। একটি তিনতলা ভবন ভাড়া নিয়ে কার্যক্রম চলছে। প্রায় প্রতিটি কক্ষে ফাইল এবং এলোমেলো কাগজের স্তূপ। সহকারী পরিচালক শহিদুল আজমের কক্ষে সিসি ক্যামেরায় বাইরের দৃশ্য দেখার ব্যবস্থা আছে। ফলে টিভি পর্দায় স্পষ্ট ভেসে উঠছে দালালদের চেহারা।

কিন্তু দালালদের প্রতিরোধ করার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। বরং অফিসের সর্বত্র বেসরকারি কোম্পানি, গাড়ির শোরুম এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি একেবারে গিজ গিজ অবস্থা। যা দেখে বোঝার উপায় নেই যে কারা বহিরাগত। কর্মকর্তাদের কক্ষে বসেই তাদের অনেকেই নিজেদের দাপ্তরিক কাজকর্ম অনায়াসে সেরে নিচ্ছেন। কেউ কেউ খোশগল্পে মত্ত।

অফিস চত্বরে পুলিশের নিরাপত্তাব্যবস্থা দেখা যায়। দায়িত্ব পালন করছিলেন এসআই আরাফাত এবং এসআই মমিনুলের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি টিম। তবে আশপাশ দিয়ে দালালচক্রের সদস্যরা ঘোরাফেরা করলেও তারা ছিলেন অনেকটা নির্বিকার।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অফিস সংলগ্ন মুনসুর আলী মার্কেটের প্রায় প্রতিটি দোকান দালালদের আনাগোনায় মুখরিত। বিশেষ করে মা-বাবার দোয়া টেলিকম, বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ ইন্সুরেন্স লিমিটিডে, জাকির এন্টারপ্রাইজ, খাজা এন্টারপ্রাইজ, সোহাগ এন্টারপ্রাইজ, ইউনাইটেড ইন্সুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, মা ফটোকপি অ্যান্ড স্টেশনারি, মাহাজ এন্টারপ্রাইজ, সায়েম কম্পিউটার ও রেসমি এন্টারপ্রাইজ ও মেঘনা ইন্সুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের অফিসে দালালদের ওঠাবসা করতে দেখা যায়।

যুগান্তর

Share This Article